মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রাষ্ট্রসংঘের সংস্কার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ক্রমশই ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে বলে মন্তব্য করলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (Jaishankar on UN Reform)। তাঁর অভিযোগ, যে দেশগুলি রাষ্ট্রসংঘের সংস্কারের পথে বাধা দিচ্ছে, তারা এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে, কিন্তু আদতে রাষ্ট্রসংঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের কোনও আগ্রহ নেই।
রাষ্ট্রসংঘের কাঠামোয় পরিবর্তন জরুরি
রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে আয়োজিত এক মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, “বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রসংঘের কাঠামোয় পরিবর্তন আনার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।” তাঁর মতে, গুরুতর সংস্কার করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন লিখিত খসড়া বা ‘টেক্সট-বেসড নেগোশিয়েশন’। কারণ, কোনও লিখিত প্রস্তাব ছাড়া প্রকৃত অর্থে আলোচনা সম্ভব নয়। ‘Ruptures & Ramparts: Building Bridges for a Changing World’ শীর্ষক ওই আলোচনার আয়োজন করেছিল অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ORF), রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন, রাষ্ট্রসংঘের ভারতীয় দফতর এবং রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশন। অনুষ্ঠানে আলোচনা পরিচালনা করেন অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন-এর সভাপতি সমীর সরণ। উপস্থিত ছিলেন জামাইকার বিদেশমন্ত্রী কামিনা জনসন স্মিথ, সুরিনামের বিদেশমন্ত্রী মেলভিন বুভা, ঘানার বিদেশমন্ত্রী স্যামুয়েল ওকুডজেটো আব্লাকওয়া এবং ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ও সিইও সেলেস্ট কনর্স।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপার্থক্য থাকবেই
জয়শঙ্কর বলেন,“প্রতি বছরই নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রাষ্ট্রসংঘ সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে এবার সেই দাবি আরও জোরালো হয়েছে। সংস্কারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের হতাশা বাড়ছে। কারণ, কোনও লিখিত খসড়া ছাড়া আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। শুধু সময় নষ্ট করার জন্য আলোচনা চলতে পারে না।” রাষ্ট্রসংঘ সংস্কারের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘‘আপনি সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সংস্কার করতে পারবেন না।’’ তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপার্থক্য থাকবেই এবং শেষ পর্যন্ত ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। তবে তার আগে প্রত্যেক পক্ষকে নিজেদের মতামত পেশ করার সুযোগ দিতে হবে।
সংস্কারের জন্য খসড়া তৈরি জরুরি
জয়শঙ্কর বলেন, রাষ্ট্রসংঘের সংস্কারের জন্য একটি খসড়া তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সেই খসড়ায় সব দেশের মতামত ও প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করে আলোচনার মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সমাধানে পৌঁছতে হবে। রাষ্ট্রসংঘের বর্তমান কাঠামো নিয়েও সরব হন জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, বিশ্বের বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় রাষ্ট্রসংঘ অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। তবে রাষ্ট্রসংঘের সংস্কারের দাবি তোলা মানেই রাষ্ট্রসংঘ-বিরোধী হওয়া নয়। বরং যারা রাষ্ট্রসংঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিই চিন্তিত, তারাই সংস্থাটিকে আরও কার্যকর করে তুলতে সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন।
রাষ্ট্রসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে
গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাও আগের তুলনায় বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, এই দেশগুলি নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও সম্পদ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে পুরনো নির্ভরতার কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এর ফলে বিশ্ব ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বও আরও শক্তিশালী হচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রসঙ্গেও বক্তব্য রাখেন জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে একজন মহিলাকে নির্বাচিত করার ভাবনা কোনও উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি নিচ থেকে উঠে আসা একটি ধারণা।
কেন নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কার প্রয়োজন
এদিকে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের বিতর্কে নিজের শেষ ভাষণেও মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় নিরাপত্তা পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করতে হবে এবং এর বৈধতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবিতে সরব ভারত। ১৯৪৫ সালে গঠিত ১৫ সদস্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ একবিংশ শতকের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায় না বলে ভারতের বক্তব্য। তাই স্থায়ী ও অস্থায়ী—দুই ধরনের সদস্যপদই সম্প্রসারণের দাবি জানিয়ে আসছে নয়াদিল্লি। নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের দাবিও ধারাবাহিকভাবে জানিয়ে এসেছে ভারত। পাশাপাশি ২০২৮-২৯ মেয়াদের জন্য অস্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার জন্যও ভারত প্রার্থী হয়েছে। আগামী বছর জুনে এই পদের নির্বাচন হওয়ার কথা।
জয়শঙ্করের কূটনৈতিক তৎপরতা
রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন জয়শঙ্কর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিদেশমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে তিনি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। বৃহস্পতিবার পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জয়শঙ্কর। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। মালদ্বীপের বিদেশমন্ত্রী ইরুথিশাম আদমের সঙ্গেও বৈঠক করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। তিনি জানান, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি বহুপাক্ষিক সহযোগিতা পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং পারস্পরিক অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার বিভিন্ন পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইরাকের উপ-প্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইনের সঙ্গে বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেন জয়শঙ্কর। পাশাপাশি ভারত ও ইরাকের অর্থনৈতিক এবং জ্বালানি সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়।
আলোচনায় ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গ
এস্তোনিয়ার বিদেশমন্ত্রী মার্গুস তসাখনার সঙ্গে বৈঠকে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত ও এস্তোনিয়ার সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। জয়শঙ্কর জানান, চলমান ইউক্রেন সংঘাতের প্রভাব এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতাও আলোচনায় উঠে আসে। ঘানার বিদেশমন্ত্রী স্যাম ওকুজেতো আব্লাকওয়ার সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা করেন জয়শঙ্কর। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও মতবিনিময় হয়। ব্রিটেনের বিদেশসচিব এড মিলিব্যান্ডের সঙ্গে বৈঠকে সংঘাতের কারণে খাদ্য ও জ্বালানি ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। তাজিকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী সিরোজিদ্দিন মুহরিদ্দিনের সঙ্গেও বৈঠক করেন জয়শঙ্কর। সেখানে আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং ভারত-তাজিকিস্তানের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়াও বার্বাডোসের বিদেশমন্ত্রী ক্রিস্টোফার পিটার সিনকলেয়ার, আর্মেনিয়ার বিদেশমন্ত্রী আরারাত মির্জোয়ান এবং সিঙ্গাপুরের বিদেশমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। রাষ্ট্রসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে ধারাবাহিক এই বৈঠকগুলিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি ইউক্রেন সংঘাত, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

Leave a Reply