Mecca Defence Agreement: ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নয়, আসলে কি ইরান-বিরোধী সুন্নি জোট? মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক

islamic-nato-mecca-defense-agreement-iran

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (Mecca Joint Defense Agreement)-কে এর উদ্যোক্তারা প্যান-ইসলামিক যৌথ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও কৌশলগত বিশ্লেষক এই চুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। সমালোচকদের একাংশের দাবি, এটি আদৌ কোনও ঐক্যবদ্ধ ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নয়। বরং চুক্তিটি ইরানকে ঘিরে সুন্নি শক্তিগুলির একটি কৌশলগত জোট হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘদিনের সুন্নি-শিয়া বিভাজন কমার বদলে আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যৌথ নিরাপত্তার আড়ালে কি সুন্নি সমীকরণ?

রিয়াধ, ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা— তিন দেশের কর্তারা বারবার জানিয়েছেন, এই ত্রিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত ‘যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতা’ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই তৈরি। কিন্তু সমালোচকদের মতে, বাস্তব ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে ধনী সুন্নি রাজতন্ত্র সৌদি আরব, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সুন্নি সন্ত্রাসী শক্তি পাকিস্তান এবং ন্যাটোর  সুন্নি সদস্য তুরস্ককে একই নিরাপত্তা কাঠামোয় নিয়ে আসার ফলে ইরানকে ঘিরে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ‘ইসলামিক ন্যাটো’-র সঙ্গে তুলনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ইরান এই জোটের বাইরে। ফলে এই চুক্তিকে সর্বজনীন ইসলামি প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে দেখার যুক্তি দুর্বল বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। তাঁদের মতে, ধর্মীয় ঐক্যের কথা বলা হলেও বাস্তবে চুক্তিটির পেছনে রয়েছে সুন্নি-শিয়া ভারসাম্য, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং জাতীয় স্বার্থের হিসাব।

তেহরান থেকে ইসলামাবাদ—চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন

চুক্তি স্বাক্ষরের পরই এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান। ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও বিদেশনীতি কমিশনের সদস্য এব্রাহিম রেজাই সৌদি আরবের নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। রেজাই বলেন, ‘‘তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগজে একটি চুক্তি করলেই সৌদি আরব নিরাপত্তা পাবে না।’’ তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন আমেরিকার উপর নির্ভর করেও সৌদি আরব যে নিরাপত্তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান পায়নি, অন্য দেশের উপর নির্ভর করে সেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি রিয়াধকে অন্যের কাছ থেকে নিরাপত্তা ‘চেয়ে নেওয়ার’ পরিবর্তে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে ভাবার পরামর্শ দেন। তবে শুধু ইরান থেকেই সমালোচনা আসেনি। চুক্তির অন্যতম অংশীদার পাকিস্তানের প্রাক্তন আমেরিকা-স্থিত রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট কূটনীতিক হুসেন হাক্কানিও এই চুক্তিকে নিয়ে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন। হাক্কানির মতে, সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবের তুলনায় প্রতীকী দিক থেকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর যুক্তি, একটি কার্যকর যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন একটি অভিন্ন শত্রু। কিন্তু তিন দেশের ক্ষেত্রে সেই অভিন্ন শত্রু কোথায়, তা স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, চুক্তির ফলে গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান এবং যৌথভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের মতো সহযোগিতা বাড়তে পারে। কিন্তু এটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে দেখার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই।

পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের স্বার্থ কি এক?

সমালোচকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। তিন দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, নিরাপত্তা অগ্রাধিকার এবং বৈদেশিক নীতি একে অপরের থেকে যথেষ্ট আলাদা। পাকিস্তানের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগের একটি ভারতকে ঘিরে সীমান্ত বিরোধ। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ইসলামাবাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা নীতি গভীরভাবে যুক্ত ন্যাটো এবং পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে। ফলে আঙ্কারার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অগ্রাধিকার রিয়াধ বা ইসলামাবাদের সঙ্গে সব ক্ষেত্রে মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সৌদি আরবের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলা, তেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করা।ফলে তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লেও একটি অভিন্ন সামরিক কৌশল বা একক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

‘ইসলামিক ন্যাটো’ কি শুধুই ভূ-রাজনৈতিক মিথ?

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা জোটের ধারণা নতুন নয়। কিন্তু বাস্তবে সুন্নি-শিয়া বিভাজন, জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ভিন্ন ভিন্ন বৈদেশিক নীতি সেই সম্ভাবনাকে বারবার দুর্বল করেছে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিও সেই একই সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, এই চুক্তি গোয়েন্দা সহযোগিতা, যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারিত্ব এবং অস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেটিকে একটি সর্বজনীন ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতার তুলনায় অনেকটাই অতিরঞ্জিত। বরং সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি কৌশলগত ও লেনদেনভিত্তিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা হিসেবেই চুক্তিটিকে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন সমালোচকেরা। শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর ঐক্যের পথ তৈরি করবে, নাকি ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন আঞ্চলিক মেরুকরণ আরও বাড়াবে— সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত ‘ইসলামিক ন্যাটো’-র স্বপ্নের চেয়ে বাস্তব ভূ-রাজনীতি ও জাতীয় স্বার্থের সমীকরণই এই জোটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share