মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ঐতিহাসিক সাফল্য পেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ চলে গেল ডেমোক্র্যাটদের হাতে। এর ফলে কংগ্রেসে (US Midterm Elections) সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। আগামী দিনে নতুন আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসনকে বিরোধীদের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
নির্বাচনের এই ফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে (Democrats) বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে আগামী দিনে প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটতে হতে পারে।
প্রশ্ন হল, এরপর কী? নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে রিপাবলিকানদের প্রস্তাবিত একতরফা আইন আটকে দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর প্রথম ১০০ ঘণ্টার জন্য একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করেছে তারা। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কর্মসূচি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একাধিক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা।
কী রয়েছে পরিকল্পনায়? (US Midterm Elections)
এই পরিকল্পনায় রয়েছে মার্কিন শুল্কনীতি প্রত্যাহারের লক্ষ্যে বিল আনা, ইরানের সঙ্গে চলা যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ এবং স্বাস্থ্যবিমার খরচ কমানোর প্রস্তাব। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এই পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে।
তবে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও নিজেদের সমস্ত প্রস্তাব সহজে আইনে পরিণত করতে পারবেন না। এর পিছনে রয়েছে দু’টি সাংবিধানিক বাধা।
প্রথমত, সেনেটে কোনও বিল ভোটাভুটির জন্য পেশ করার ক্ষেত্রে সাধারণত অন্তত ৬০ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। সেনেটের মোট আসন ১০০টি। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ৬০টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করাতে তাঁদের রিপাবলিকানদের একাংশের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। তবে সরকারি ব্যয় ও কর সংক্রান্ত বাজেট সমন্বয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আনা কিছু বিলের ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যতিক্রম রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কোনও বিল কংগ্রেসে পাস হলেও প্রেসিডেন্ট চাইলে তাতে ভেটো দিতে পারেন। সেই ভেটো অগ্রাহ্য করে বিলটি কার্যকর করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেট—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তে নামতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা
নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ তদন্তমূলক ক্ষমতা এসেছে। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে তাঁরা সরকারি নথি তলব করতে পারবেন, সাক্ষীদের হাজিরার নির্দেশ দিতে পারবেন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কাজকর্ম নিয়ে কংগ্রেসীয় তদন্ত শুরু করতে পারবেন।
ইতিমধ্যেই ট্রাম্প এবং তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের প্রশাসনিক ক্ষমতার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা। ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক আধিকারিক এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীরাও তদন্তের আওতায় আসতে পারেন।
সম্প্রতি এক নির্বাচনী জনসভায় ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদের নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেন, “যাঁরা আমেরিকার মানুষের অর্থ চুরি করেছেন, তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন কিংবা সাধারণ মানুষের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন, নতুন কংগ্রেসের প্রথম দিন থেকেই তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।”
ডেমোক্র্যাট দলের একাংশ বিচার বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই সংস্থাগুলির নেতৃত্বে রয়েছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশানা করার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে (US Midterm Elections)।
গত মাসে মেইনে আয়োজিত এক জনসভায় প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট নেত্রী আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ বলেন, “প্রথম দিন থেকেই এই সমস্ত সরকারি সংস্থার প্রধানদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা প্রয়োজন।”
তৃতীয়বার ইমপিচমেন্টের মুখে ট্রাম্প?
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের জন্য ইমপিচমেন্টের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন ডেমোক্র্যাট দলের কয়েকজন সদস্য। তবে এই বিষয়ে দলের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাটরা চাইলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পাস করাতে পারেন। কিন্তু তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে সরাতে হলে সেনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই সমর্থন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
কমলা হ্যারিস এবং হিলারি ক্লিন্টনের মতো ডেমোক্র্যাট নেত্রীরা অবশ্য ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে নন। তাঁদের মতে, এই বিষয়ে শক্তি ব্যয় না করে দলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক লক্ষ্যে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
তবে ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য নিশানায় পরিণত হতে পারেন। তাঁকে অভিশংসনের দাবিতে ইতিমধ্যেই একটি প্রস্তাব এনেছেন বিদায়ী রিপাবলিকান প্রতিনিধি টমাস ম্যাসি। ইরান, ভেনেজুয়েলা, ইয়েমেন-সহ বিভিন্ন দেশে আমেরিকার সামরিক পদক্ষেপের সঙ্গে এই প্রস্তাবের সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে, নির্বাচনী প্রচারে জেফ্রিস একাধিকবার জানিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটরা পিট হেগসেথকে তাঁর পদ থেকে সরানোর চেষ্টা করবেন।
গত মাসের শেষ দিকে এক সাক্ষাৎকারে জেফ্রিস বলেন, “প্রেসিডেন্টের উচিত পিট হেগসেথকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া। তা না হলে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে আমাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।”
তবে হেগসেথ কিংবা ট্রাম্প—কারও বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়াকে তিনি সরাসরি সমর্থন করেছেন কি না, তা স্পষ্ট (US Midterm Elections) করেননি।
নতুন কংগ্রেসের আগে গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন
নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেও নতুন কংগ্রেসের সদস্যরা আগামী ৩ জানুয়ারির আগে শপথ নেবেন না। তার আগে বর্তমান কংগ্রেসের সদস্যরা ৯ নভেম্বর থেকে আবার অধিবেশনে বসবেন। তাঁদের সামনে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল, আগামী ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন সরকারি ব্যয় বরাদ্দ সংক্রান্ত বিল পাস করানো। কারণ ওই দিনই বর্তমান সরকারি অর্থায়নের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন অর্থ বরাদ্দের বিল পাস না হলে মার্কিন সরকারের একাধিক পরিষেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ফের সরকারি অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমনটা হলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সির সময়ে চতুর্থবারের মতো সরকারি পরিষেবা বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বছরের শেষ দিকে এই ঘটনা আমেরিকার রাজনীতিতে আরও অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
নিয়োগ-বরখাস্তেও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব
মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সেনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগের প্রস্তাব সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন পেলে তবেই কার্যকর হয়।
ফলে সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ট্রাম্পের কাছে বড় রাজনৈতিক বাধা হয়ে উঠতে পারে। তাঁর পছন্দের প্রার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে (Democrats) নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধীরা বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন।
গত সেপ্টেম্বরে ডেমোক্র্যাটদের সেনেট নেতা চাক শুমার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমরা সেনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চাই, কারণ ট্রাম্প যাতে সুপ্রিম কোর্ট এবং নিম্ন আদালতগুলিতে তাঁর পছন্দের চরম রক্ষণশীল বিচারপতিদের নিয়োগ করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন বিচারপতির বয়স অবসরের সাধারণ বয়সসীমার অনেকটাই বেশি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রক্ষণশীল বিচারপতি ক্লারেন্স টমাস এবং স্যামুয়েল আলিটো।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের আগেই অবসর নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন বিচারপতি আলিটো। বিচারপতি টমাসও দায়িত্বে থেকে যেতে চান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে (US Midterm Elections)।
রিপাবলিকানদের হাতে সেনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতেই তাঁদের অবসরের জন্য চাপ দেওয়া হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁরা দায়িত্ব ছাড়বেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত তাঁদের নিজেদেরই।
অন্যদিকে, ট্রাম্প চাইলে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের বরখাস্ত করে নতুন ব্যক্তিদের নিয়োগ করতে পারবেন। কারণ মন্ত্রিসভার সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে। ফলে প্রশাসনের অভ্যন্তরে রদবদলের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের বাধা দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
সব মিলিয়ে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নয়া রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক (Democrats) নিয়োগ এবং সরকারি নীতির বাস্তবায়ন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে হোয়াইট হাউসকে। আগামী দু’বছর আমেরিকার রাজনীতিতে এই ক্ষমতার ভারসাম্য (US Midterm Elections) কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply