তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
সামান্য সতর্কতার অভাবেই বাড়ছে বিপদ! বিশেষত ভারতীয় মহিলাদের জন্য নিঃশব্দে বিপদ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, স্কুল স্তর থেকেই সচেতনতা জরুরি। না হলে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে। এ দেশের জনস্বাস্থ্যে দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে থাইরয়েড। গলায় থাকা এই হরমোন গ্রন্থি এখন উদ্বেগের কারণ। বিশেষত ভারতীয় মহিলাদের জন্য বাড়তি বিপদ তৈরি করছে।
ভারতীয় মহিলাদের জন্য কেন বাড়তি উদ্বেগ?
সাম্প্রতিক এক সর্বভারতীয় সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের ১৫ শতাংশ মহিলা থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, শহুরে মহিলাদের মধ্যে থাইরয়েডের সমস্যা আরও বাড়ছে। বিশেষত বয়স তিরিশের চৌকাঠ পেরোলেই এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ভারতীয় পুরুষদের তুলনায় ভারতীয় মহিলারা ৪ গুন বেশি থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত হন।
থাইরয়েডের সমস্যা কী?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, গলার কাছে থাকে থাইরয়েড গ্রন্থি। এই গ্রন্থি থেকে হরমোন নিঃসরণ হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেশি বা কম হরমোন নিঃসরণ শুরু হলে শরীরের একাধিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। সেটাই থাইরয়েড সমস্যা হয়। ভারতে অধিকাংশ থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্তের দেখা গিয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণ হরমোন নিঃসরণ হয়। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়। ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে এই সমস্যা প্রবল ভাবে বাড়ছে।
কেন ভারতীয় মহিলারা থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন?
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের ভারসাম্যের ব্যাপাক পরিবর্তন!
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, পুরুষদের তুলনায় মহিলারা থাইরয়েড সমস্যায় কয়েক গুণ বেশি ভুগছেন। তার প্রধান কারণ হলো হরমোন ঘটিত পরিবর্তন। তাঁরা জানাচ্ছেন, মহিলাদের জীবনের একাধিক সময়ে শরীরে হরমোন ঘটিত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়। তার ফলে একাধিক হরমোন গ্রন্থির সক্রিয়তার সমীকরণ বদলে যায়। বয়ঃসন্ধিকালে ঋতুস্রাব শুরুর সময়, গর্ভাবস্থায়, সন্তান প্রসবের পরে এবং ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পরবর্তী সময়ে মহিলাদের শরীরের একাধিক হরমোন ঘটিত পরিবর্তন হয়। এর জেরে থাইরয়েড গ্রন্থির উপরেও গভীর প্রভাব পড়ে। থাইরয়েড নিঃসরণের পরিবর্তন ঘটে। তাই মহিলাদের থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে। বিশেষত মহিলাদের গর্ভাবস্থায় এবং সন্তান প্রসব পরবর্তীকালে একাধিক শারীরিক পরিবর্তন হয়। তাই সেই সময়ে এই ধরনের হরমোন ঘটিত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
আয়রনের ঘাটতি!
ভারতীয় মহিলারা আয়রনের ঘাটতিতে ভোগে। ১২ বছরের পর থেকেই অধিকাংশ ভারতীয় মেয়ের শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম থাকে। আয়রনের অভাব মহিলাদের থাইরয়েডের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাছাড়া, বহু মহিলা পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। ভারতীয় মেয়েদের থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ অপুষ্টি। এমনটাই জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ।
মানসিক চাপ এবং অনিদ্রা!
ভারতীয় মহিলারা অধিকাংশ পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে ভোগেন। পারিবারিক সমীকরণ এবং কাজের পরিবেশ ভারতে বদলে যাচ্ছে। মহিলাদের জন্য চাপ বাড়ছে। পরিবারের একাধিক দায়িত্ব তাদের সামলানোর পাশপাশি পেশাগত জীবনেও দায়িত্ব বাড়ছে। একদিকে বিভিন্ন পর্যায়ে শরীরের পরিবর্তন, আবার আরেক দিকে সামাজিক চাপ বেড়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে ভারতীয় মহিলাদের মানসিক চাপ ও অবসাদের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শহুরে ভারতীয় মহিলারা অনিদ্রার সমস্যায় ভুগছেন। এগুলো শরীরের হরমোন নিঃসরণে প্রভাব ফেলছে। তাই থাইরয়েড গ্রন্থিতেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
অটোইমিউন রোগের জেরে বিপদ বাড়ছে!
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, একাধিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতীয় মহিলারা অটোইমিউন রোগের শিকার বেশি হন। অর্থাৎ, নিজের শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করে। তাই অটোইমিউন ডিজিজ থাকলে, তার থাইরয়েড গ্রন্থিও সমস্যায় পড়ে। রোগের জটিলতা বাড়ে।
কেন থাইরয়েড বাড়তি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে?
থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে প্রয়োজনের বেশি বা কম পরিমাণ হরমোন নিঃসরণ হলে শরীরে তার গভীর প্রভাব পড়ে। মহিলাদের থাইরয়েডের সমস্যা একাধিক জটিলতা তৈরি করছে—
- ● চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত হলে মহিলাদের একাধিক হরমোন ঘটিত সমস্যা তৈরি হয়। যার ফলে মহিলাদের গর্ভধারণ জটিল হয়ে যায়। দেশ জুড়ে বন্ধ্যত্বের সমস্যা বাড়ছে। আর তার নেপথ্যে অন্যতম কারণ হলো থাইরয়েডের সমস্যা। এই সমস্যায় আক্রান্ত মহিলা গর্ভধারণ করলেও একাধিক ঝুঁকি ও জটিলতা তৈরি হয়। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাছাড়া, গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এই রোগের প্রভাব পড়তে পারে।
- ● থাইরয়েডের সমস্যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। আবার রক্তচাপ ওঠানামা করে। অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত কোলেস্টেরল হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
- ● থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে দ্রুত হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি থাকে। থাইরয়েডের সমস্যা দীর্ঘদিন অবহেলা করলে হাড়ের স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে হাইপারথাইরয়েডিজমে শরীরে অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন তৈরি হলে হাড় দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে। এতে ক্যালসিয়াম কমে গিয়ে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে এবং সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে, বিশেষত মেনোপজের পর এই ঝুঁকি আরও বেশি। তাই সময়মতো থাইরয়েড পরীক্ষা, সঠিক চিকিৎসা, ক্যালসিয়াম-ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাদ্য এবং নিয়মিত ব্যায়াম অত্যন্ত জরুরি।
- ● তবে যে দিকটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে, তা হলো মানসিক স্বাস্থ্য। দেশ জুড়ে একাধিক মানসিক সমস্যা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অবসাদ, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপের মতো নানান মানসিক সমস্যায় আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। থাইরয়েডের সমস্যা হলে মানসিক স্বাস্থ্যে তার গভীর প্রভাব পড়ে। এমনটাই জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, এই হরমোন ঘটিত সমস্যার জেরে খিটখিটে ভাব বাড়ে, কাজের প্রতি অনীহা তৈরি হয়, ক্লান্তি বোধ বাড়ে, আবার রাগ এবং দুশ্চিন্তার মতো সমস্যা বেশি হয়। সব মিলিয়ে আক্রান্তের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে গভীর প্রভাব পড়ে। ভারতের এই বিপুল সংখ্যক মহিলার থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ফলে মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত হচ্ছে। এর জেরে আরও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
থাইরয়েড নিয়ে সচেতনতা জরুরি
চিকিৎসকদের একাংশের পরামর্শ, থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ে সচেতনতা জরুরি। স্কুল স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের এই রোগ সম্পর্কে সতর্ক করলে, সামাজিক সচেতনতার মান বাড়বে। অত্যন্ত বেশি চুল পড়ার সমস্যা, চামড়া কুঁচকে যাওয়া, রুক্ষভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি বোধ এবং অকারণে মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকার মতো সমস্যায় দিনের পর দিন ভুগলে, কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ মতো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি। সাধারণ সহজ স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায়, থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত কিনা! তাই সেই পরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তাহলেই পরিস্থিতি জটিল হবে না। বর্তমানে ভারতে থাইরয়েড সমস্যা মোকাবিলার উপযুক্ত ওষুধ রয়েছে। তাই চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, রোগ চিহ্নিত হলেই পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হয়ে যাবে।

Leave a Reply