তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে কোচিং ক্লাস থেকে ফেরার সময় হোক কিংবা অফিস থেকে বেরিয়ে, দিনভরের ক্লান্তি দূর করতে আর মেজাজ ফুরফুরে রাখতে, রাস্তায় সাজানো থাকে নানান পসরা! জিভে জল আনা খাবারের কমতি নেই সেখানে! রাস্তার পাশে কম দামে সহজেই নানান খাবার! আর তাতেই মজে আট থেকে আশি! স্কুল-কলেজের পড়ুয়া থেকে অফিস যাত্রী কমবেশি সকলেই সন্ধ্যার মুখরোচক খাবারে নজর থাকে। লেবু আর তেঁতুল জল দেওয়া ফুচকা হোক কিংবা মিষ্টি রঙিন সরবত, দিনের নানান ক্লান্তি কাটাতে, এমন মুখোরোচক খাবারের তুলনা নেই। কিন্তু চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, এই জিভে জল আনা খাবারেই বিপদ বাড়ছে! বিশেষত বর্ষার ভোগান্তি বাড়াবে এই ধরনের খাবার। সাবধানতা বজায় রাখতে না পারলেই সঙ্কট বাড়তে পারে।
কোন কোন খাবারে ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বর্ষায় জলবাহিত রোগের দাপট বাড়ে। বিশেষত রাজ্যের একাধিক জায়গায় যেভাবে জমা জলের সমস্যা রয়েছে, তার জেরে বর্ষায় রোগের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, বর্ষায় সুস্থ থাকতে তাই বাড়তি সতর্কতা জরুরি। চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বর্ষায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি বাড়ায় জলবাহিত রোগ।
ফুচকা
পেটের অসুখ, টাইফয়েড এমনকি নানান রকমের হেপাটাইটিসের নেপথ্যে থাকে অপরিশ্রুত জল। ফুচকার মতো খাবার থেকে লিভার এবং পাকস্থলীর অসুখের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, ফুচকার সঙ্গে তেঁতুল ও লেবুর রস মেশানো জল খাওয়া হয়। এই জল সব দোকানে সমান পরিশ্রুত থাকে না। ফলে সেই জল থেকে নানান অসুখের ঝুঁকি তৈরি হয়। বর্ষায় যে কোনও জায়গায় জলে সহজেই ভাইরাস সংক্রমণ ঘটতে পারে। তাই জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। ফুচকা থেকে তাই সহজেই রোগ সংক্রমণ হতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রঙিন সরবত
ফুচকার পাশপাশি রঙিন সরবত নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, হঠাৎ প্রচন্ড বৃষ্টি হলেও, রোদের পারদ যথেষ্ট থাকছে। আবহাওয়ার রকমফেরে অস্বস্তি বাড়ছে। এর ফলে সাময়িক আরাম পাওয়ার জন্য অনেকেই রাস্তায় নানান রকমের রঙিন সরবত খাচ্ছেন। কিন্তু এই ধরনের রঙিন সরবত ভোগান্তি বাড়াতে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, রঙিন সরবতে যে জল ব্যবহার করা হয়, অনেক সময়েই তার গুণমান ঠিক থাকে না। তাছাড়া, রাস্তার ধুলো-বালি মিশে, সেই জলের মানের অবনমন ঘটে। সব মিলিয়ে সেই সরবত থেকে সহজেই লিভারে যে কোনও সংক্রমণ ঘটতে পারে।
কাটা ফল
বর্ষার মরশুমে বাজারে কাটা ফল বা ফ্রুট চাট জাতীয় খাবার বাড়তি বিপদ তৈরি করতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, বর্ষার মরশুমে ডায়েরিয়া-কলেরার মতো রোগের প্রকোপ বাড়ে। বর্ষার জমা জল ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এই ধরনের রোগের দাপট বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে খাবারের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সজাগ থাকা জরুরি। রাস্তার কাটা ফল বা ফ্রুট চাট জাতীয় খাবারে যে ধরনের ফল ও মশলা ব্যবহার করা হয়, এতে কলেরার মতো রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ, কাটা ফলে সহজেই ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস সংক্রামিত হয়। তাই এই ধরনের খাবার থেকে বর্ষার রোগের দাপট বাড়তে পারে।
কোন ধরনের রোগ নিয়ে বাড়তি উদ্বিগ্ন চিকিৎসক মহল?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বর্ষায় সবচেয়ে বেশি বিপদ বাড়ায় লিভারের অসুখ। তাঁরা জানাচ্ছেন, হেপাটাইটিস এ-সহ একাধিক সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়াও ডায়ারিয়া, টাইফয়েডের মতো রোগের দাপট ও বাড়ে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকা এবং খাবার খাওয়ার জেরেই এই ধরনের রোগের প্রকোপ বাড়ছে। জন্ডিস, টাইফয়েডের মতো রোগে লিভার কিংবা অন্ত্রের জটিল সমস্যার পাশপাশি লিভার বা পাকস্থলীর সংক্রমণ থেকে জ্বর, পেট ব্যথা, বমির মতো দুর্ভোগ বাড়তে পারে বলেও জানাচ্ছেন তাঁরা। এছাড়াও পেটের সাধারণ রোগ ও হজমের গোলমালের সমস্যা ও দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কয়েক দিন বৃষ্টি না হলেই তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। অস্বস্তি বাড়ছে। রোদের দাপটে নাজেহাল। আবার একনাগাড়ে বৃষ্টির জেরে হঠাৎ করেই তাপমাত্রার পারদ কমে যাচ্ছে। আবার প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টির জেরে জল জমে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে একদিকে পরিবেশের এই তারতম্য, আরেকদিকে জমা জলের দূর্ভোগ, মানুষের স্বাস্থ্য ভোগান্তিও বাড়াতে পারে। তাই বাড়তি সতর্কতার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভোগান্তি কমাতে কী করতে হবে?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বর্ষার রোগের দাপট কমাতে সবচেয়ে জরুরি সচেতনতা। সতর্ক থাকলেই সংক্রামক রোগের দাপট কমবে। তাই তাঁদের পরামর্শ, খোলা খাবার খাওয়া একেবারেই চলবে না। বরং পরিষ্কার জায়গায় খাবার খাচ্ছেন কিনা, এই আবহাওয়ায় সে নিয়ে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। পরিশ্রুত পানীয় জল খেতে হবে। যাতে জলবাহিত রোগের ঝুঁকি কমে। জল পরিশ্রুত কিনা সেদিকে নজর দেওয়ার পাশপাশি যে পাত্রে জল রাখা হচ্ছে এবং যে পাত্রে জল খাওয়া হচ্ছে, সেটা ঠিক আছে কিনা, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। কারণ সেগুলো থেকেও রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। শৌচালয় ব্যবহারের পরে এবং খাবার খাওয়ার আগে এবং পরে হাত ধোয়ার ব্যাপারে বাড়তি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। যাতে কোনও রকম জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি না হয়।

Leave a Reply