মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে শিল্পক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের বার্তা দিলেন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। কলকাতা থেকে রবিবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীন পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রাউনফিল্ড সম্প্রসারণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে জাহাজ নির্মাণ, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং শিল্প পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে বলে দাবি কেন্দ্রের। অনুষ্ঠানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত ছিলেন। এদিনের কর্মসূচিতে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের পরিবেশ নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স বা জিআরএসই-র সম্প্রসারণ এবং যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেডের নতুন পরিকাঠামোর গুরুত্ব তুলে ধরেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
‘কারখানা বন্ধ হওয়ার দিন অতীত’, রাজনাথের বার্তা
কলকাতার অনুষ্ঠানে রাজনাথ সিং বলেন, পশ্চিমবঙ্গ এখন শিল্প ও উন্নয়নের নতুন পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। তাঁর কথায়, বাংলায় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া বা শিল্পে তালা ঝোলার সময় এখন অতীত। তার পরিবর্তে নতুন প্রকল্প, বিনিয়োগ এবং শিল্প পরিকাঠামো গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজনাথ বলেন, “শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বাংলায় উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ চলছে। তৈরি হচ্ছে নতুন সুযোগও।” তাঁর দাবি, এই পাঁচটি প্রকল্প বাংলার শিল্প পরিকাঠামোয় নতুন গতি আনবে এবং একই সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করবে।
কী রয়েছে পাঁচ প্রকল্পে?
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে তিনটি গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (GRSE) এবং দুটি যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেডের অধীনে রয়েছে। জিআরএসই-র সম্প্রসারণ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে রায়চকে নতুন শিপইয়ার্ড, হাওড়ায় টিম্বার পন্ড শিপবিল্ডিং ফেসিলিটি এবং দামোদর কমপ্লেক্স শিপ বিল্ডিং ফেসিলিটি। অন্যদিকে যন্ত্র ইন্ডিয়ার প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে ৩,০০০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রলিক ওপেন ডাই ফোর্জিং প্রেস এবং একটি রেডিয়াল ফোর্জিং প্ল্যান্ট। এই প্রকল্পগুলিতে বিপুল বিনিয়োগের ফলে জাহাজ নির্মাণের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বাংলার ভূমিকা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
রায়চকে তৈরি হবে ২০০ মিটার দীর্ঘ যুদ্ধজাহাজ
জিআরএসই-র সম্প্রসারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল রায়চকে নতুন শিপইয়ার্ড। রাজনাথ সিং জানান, সেখানে প্রায় ২০০ মিটার দীর্ঘ যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের সক্ষমতা তৈরি করা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য পরিকল্পিত পরবর্তী প্রজন্মের ডেস্ট্রয়ার নির্মাণের দরপত্রে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে জিআরএসই আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, হাওড়ার টিম্বার পার্ক এবং দামোদর কমপ্লেক্সের পরিকাঠামোও জাহাজ নির্মাণের সম্পূর্ণ ‘ভ্যালু চেইন’-কে আরও শক্তিশালী করবে। অর্থাৎ জাহাজের নকশা ও নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান ও পরিষেবা সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত শিল্পগুলিও এর ফলে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এমএসএমই-তে বাড়বে কাজের সুযোগ
এই প্রকল্পগুলিকে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা শিল্পের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখছে না কেন্দ্র। জিআরএসই-র নতুন পরিকাঠামোকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা এমএসএমই ক্ষেত্রেও নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ারিং, ধাতু, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহণ এবং বিভিন্ন সহায়ক শিল্পের চাহিদা বাড়লে রাজ্যের শিল্পাঞ্চলগুলিও তার সুফল পেতে পারে।
আত্মনির্ভর ভারত ও ‘মেক ফর দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ জোর
রাজনাথ সিং বলেন, পাঁচটি প্রকল্পই ভারতের ‘আত্মনির্ভরতা’, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘মেক ফর দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর লক্ষ্যকে আরও শক্তিশালী করবে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর যে পরিকল্পনা কেন্দ্র নিয়েছে, এই প্রকল্পগুলি তারই অংশ বলে জানান তিনি। জিআরএসই-র সাম্প্রতিক সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। নবরত্ন মর্যাদা পাওয়ায় সংস্থাটিকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, নবরত্ন জিআরএসই এবং যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেড শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্য নয়, গোটা দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
নেক্সট জেনারেশন অফশোর পেট্রোল ভেসেলে ৮০ শতাংশের বেশি দেশীয় উপাদান
ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনে দেশীয় প্রযুক্তি ও উপাদানের ব্যবহার কতটা বাড়ছে, তার উদাহরণ হিসেবে নেক্সট জেনারেশন অফশোর পেট্রোল ভেসেল নির্মাণের কথাও তুলে ধরেন রাজনাথ সিং। তিনি জানান, এই ধরনের জাহাজে ৮০ শতাংশের বেশি দেশীয় সরঞ্জাম থাকার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বিদেশের উপর ভারতের নির্ভরতা দ্রুত কমছে।
জিআরএসই-র সম্প্রসারণে নতুন শিল্প সম্ভাবনা
জিআরএসই ইতিমধ্যেই কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় জাহাজ নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সংস্থার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্টের সঙ্গে হুগলি নদীর দুই পাড়ে থাকা দুটি ছোট শিপইয়ার্ড এবং রায়চকের প্রায় ৩২ একর নদী তীরবর্তী জমি ব্যবহারের জন্য লিজ চুক্তি করা হয়েছে। এই পরিকাঠামো যুক্ত হলে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে কলকাতা ও হাওড়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইঞ্জিনিয়ারিং ও সহায়ক শিল্পগুলিও নতুন অর্ডার পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসা রাজনাথকে
অনুষ্ঠানে জিআরএসই-র সম্প্রসারণে বিপুল বিনিয়োগকে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বাংলায় বিনিয়োগ আনার প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য রাজনাথ সিংকে ধন্যবাদ জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কেন্দ্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রাজ্যে বিনিয়োগ ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প আনার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বের প্রশংসাও করেন তিনি।
সব মিলিয়ে কলকাতা থেকে শুরু হওয়া এই পাঁচ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্প, জাহাজ নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট এমএসএমই ক্ষেত্রের সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হল। কেন্দ্রের দাবি, এই বিনিয়োগ শুধু কয়েকটি কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াবে না, বরং বাংলাকে দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও জাহাজ নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

Leave a Reply