Election Commission India: বাংলার গণতন্ত্রে নারীশক্তির জয়গান, প্রথম দফায় পুরুষদের ছাপিয়ে গেল মহিলা ভোটারদের হার, শীতলকুচিতে ৯৭.৫৩ শতাংশ

election commission 2026 and west benagal election news a celebration of womens power in bengals democracy female voter turnout surpasses men in the first phase of elections reaching 97 53% in sitalkuchi

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই রাজনৈতিক সচেতনতার (Bengal Assembly Election 2026) নিরিখে অগ্রগণ্য। সম্প্রতি গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় সেই সচেতনতার এক অনন্য প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। বিশেষত জঙ্গলমহল ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে যেখানে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে এক অভূতপূর্ব ভোটদানের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে— পুরুষ ভোটারদের তুলনায় মহিলা ভোটারদের উপস্থিতির হার অনেক বেশি। নির্বাচন কমিশনের (Election Commission India) জানিয়েছে ১৫২টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হয়েছে। তার মধ্যে ২৩টি কেন্দ্রে পুরুষের তুলনায় মহিলারা বেশি পরিমাণে ভোট প্রদান করেছেন। এটি কেবল একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিসংখ্যান নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ ও প্রান্তিক স্তরে নারী ক্ষমতায়ন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এক বিরাট ইঙ্গিত।

পরিসংখ্যানের দর্পণে নারী ভোটাধিকার (Election Commission India)

নির্বাচন কমিশনের (Election Commission India) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফার বেশ কিছু কেন্দ্রে দেখা গিয়েছে যে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে মহিলারা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ছিলেন। অনেক কেন্দ্রে দেখা গিয়েছে, পুরুষদের ভোটের হার যেখানে ৭৯ বা ৮০ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে, সেখানে মহিলাদের ভোটের হার ৮৩ থেকে ৮৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামের মতো জেলাগুলোতে এই চিত্র অত্যন্ত স্পষ্ট। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে রোদ উপেক্ষা করেও মহিলাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ (Bengal Assembly Election 2026) প্রমাণ করে যে, নীতি নির্ধারণ এবং সরকার গঠনে নিজেদের ভূমিকার গুরুত্ব তাঁরা উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে কী কারণ?

সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল মহিলা ভোটের হার বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। যা হল-

রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রচার

সবকটি রাজনৈতিক দলই বর্তমানে তাদের নির্বাচনী ঘোষণাপত্রে মহিলাদের জন্য বিশেষ প্রতিশ্রুতি রেখেছে। রাজনৈতিক সভাগুলোতে মহিলাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। নারীদের কেন্দ্র করে যে ধরণের প্রচার চালানো হয়েছে, তা তাঁদের মধ্যে এক ধরণের গুরুত্ববোধ তৈরি করেছে।

নিরাপদ পরিবেশ

নির্বাচন কমিশনের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি মহিলাদের মনে সাহস জুগিয়েছে। নির্ভয়ে ভোট (Bengal Assembly Election 2026) দেওয়ার পরিবেশ তৈরি হওয়ার কারণেই ঘরের কাজ সামলেও গ্রাম বাংলার মহিলারা দলে দলে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছেছেন।

গণতন্ত্রের সুফল ও ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

ভোটার তালিকায় লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার জন্য নির্বাচন কমিশন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্তকরণ থেকে শুরু করে সচেতনতা শিবির—সবক্ষেত্রেই মহিলাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফার এই পরিসংখ্যান (Election Commission India) সেই প্রচেষ্টারই সাফল্য।

আসুন দেখে নিই কোন জেলায় ভোটের পরিমাণ কত

ভোট পড়েছে ৯৩.১৯ শতাংশ। মোট ভোটদাতার সংখ্যা ৩ কোটি ৩৬ লক্ষ।

  • শীতলকুচিতে— ৯৭.৫৩ শতাংশ। ভোটদানের হারে তার পরেই রয়েছে ভগবানগোলা— ৯৬.৯৫ শতাংশ, রানিনগর— ৯৬.৯৫ শতাংশ এবং রঘুনাথগঞ্জ— ৯৬.৯ শতাংশ। প্রথম দফার মোট ৪৪টি কেন্দ্রে ৯৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে।
  • কান্দিতে পুরুষ ও মহিলা ভোটদাতার ব্যবধান সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৫ হাজার। সেখানে মহিলার চেয়ে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা দু’হাজার কম। ভোট দিয়েছেন ৯১ হাজার পুরুষ এবং ১.০৬ লক্ষ মহিলা। ভোটের হার ৮৪.৯৪ শতাংশ।
  • ঘাটালে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা মহিলার চেয়ে প্রায় ছ’হাজার বেশি। তবে সেখানে ভোট বেশি পড়েছে মহিলাদেরই। ১.২৩ লক্ষ মহিলা এবং ১.১৬ লক্ষ পুরুষ ভোট দিয়েছেন এই কেন্দ্রে। পুরুষ ও মহিলা ভোটদাতার ব্যবধান প্রায় সাত লক্ষ।
  • দাসপুরে মহিলাদের চেয়ে প্রায় তিন হাজার বেশি পুরুষ ভোটার রয়েছেন। তবে ১.১৯ লক্ষ পুরুষ ভোট দিয়েছেন এই কেন্দ্রে। মহিলা ভোটদাতার সংখ্যা ১.৩১ লক্ষ।
  • ডেবরায় ১.০৭ লক্ষ পুরুষ বুথে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। মহিলা ভোটদাতার সংখ্যা ১.০৮ লক্ষ। তবে ভোটার হিসাবে মহিলার চেয়ে পুরুষের সংখ্যা হাজারখানেক বেশি এই কেন্দ্রে।
  • মেদিনীপুরেও মহিলারা বেশি ভোট দিয়েছেন। এই কেন্দ্রে অবশ্য পুরুষের চেয়ে মহিলা ভোটারের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার বেশি। ভোট দিয়েছেন ১.১৮ লক্ষ পুরুষ এবং ১.২২ লক্ষ মহিলা।
  • বাঁকুড়ায় পুরুষ এবং মহিলা ভোটারের সংখ্যায় তফাত সামান্য। মহিলাদের চেয়ে সেখানে প্রায় ৫০০ জন পুরুষ বেশি রয়েছেন। তবে ভোট মহিলারাই বেশি দিয়েছেন। এই কেন্দ্রে ১.১৭ লক্ষ পুরুষ এবং ১.১৮ লক্ষ মহিলা ভোট দিয়েছেন।
  • ময়ূরেশ্বরে মহিলার চেয়ে হাজারখানেক পুরুষ ভোটার বেশি রয়েছেন। ১.০৫ লক্ষ পুরুষ এবং ১.০৬ লক্ষ মহিলা সেখানে ভোট দিয়েছেন। ভোটের হার ৯৩.৮৪ শতাংশ।
  • রামপুরহাটে পুরুষের চেয়ে মহিলা ভোটারের সংখ্যা প্রায় দু’হাজার বেশি। এই কেন্দ্রে ১.১৪ লক্ষ পুরুষ এবং ১.১৬ লক্ষ মহিলা ভোট দিয়েছেন। ভোটের হার ৯৪.৫৩ শতাংশ।
  • রামনগরে মহিলার তুলনায় পুরুষ ভোটার বেশি ছ’হাজার। তবে মহিলাদের ভোট বেশি পড়েছে। ১.২০ লক্ষ পুরুষ এবং ১.২২ লক্ষ মহিলা সেখানে ভোট দিয়েছেন। ভোটের হার ৯০.০২ শতাংশ।
  • বহরমপুরে পুরুষের চেয়ে চার হাজার বেশি মহিলা ভোটার রয়েছে। ১.০৮ লক্ষ পুরুষ এবং ১.১২ লক্ষ মহিলা ভোট দিয়েছেন এই কেন্দ্রে। ভোটের হার ৯১.৭২ শতাংশ।
  • ভরতপুরে মহিলাদের চেয়ে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বেশি। কিন্তু সেখানে ১.০৫ লক্ষ পুরুষ এবং ১.০৭ লক্ষ মহিলা ভোট দিয়েছেন। ভোটের হার ৮৯.১৭ শতাংশ।
  • বড়ঞায় মহিলার চেয়ে ন’হাজার বেশি পুরুষ ভোটার রয়েছেন। ভোট দিয়েছেন ৯১ হাজার পুরুষ এবং ৯৬ হাজার মহিলা। ভোটের হার ৮৭.৮০ শতাংশ।
  • খড়গ্রামে মহিলাদের চেয়ে ১০ হাজার পুরুষ ভোটার বেশি রয়েছেন। ভোট দিয়েছেন ৯৮ হাজার পুরুষ এবং ১.০৪ লক্ষ মহিলা। ভোটের হার ৮৮.৩২ শতাংশ।
  • নবগ্রামে পুরুষের সংখ্যা মহিলার চেয়ে ছ’হাজার বেশি। ভোট দিয়েছেন ১.০৭ লক্ষ পুরুষ এবং ১.১২ লক্ষ মহিলা। ভোটের হার ৯০.৭৩ শতাংশ।
  • শামসেরগঞ্জে মহিলার চেয়ে পাঁচ হাজার বেশি পুরুষ ভোটার রয়েছেন। ভোট দিয়েছেন ৭৪ হাজার পুরুষ এবং ৮০ হাজার মহিলা। ভোটের হার ৯৬.০৪ শতাংশ।
  • মালদহের ইংলিশ বাজারে পুরুষের চেয়ে মহিলা ভোটার দু’হাজার বেশি। সেখানে ভোট দিয়েছেন ১.১৩ লক্ষ পুরুষ এবং ১.১৭ লক্ষ মহিলা। ভোটের হার ৯২.৬৮ শতাংশ।
  • মালদায় মহিলাদের চেয়ে পুরুষ ভোটার বেশি তিন হাজার। ভোট দিয়েছেন ১ লক্ষ ৯ হাজার ১৬১ জন পুরুষ এবং ১ লক্ষ ৯ হাজার ৭৩৪ জন মহিলা। ভোটের হার ৯৪.৬২ শতাংশ।
  • রায়গঞ্জে মহিলার চেয়ে হাজারখানেক পুরুষ ভোটার বেশি রয়েছেন। ভোট দিয়েছেন ৮০ হাজার পুরুষ এবং ৮১ হাজার মহিলা। ভোটের হার ৯২.৯৭ শতাংশ।
  • মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি কেন্দ্রে মহিলা ভোটারের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে হাজারখানেক বেশি। ভোট দিয়েছেন ১.২২ লক্ষ পুরুষ এবং ১.২৫ লক্ষ মহিলা। ভোটের হার ৯২.৬৯ শতাংশ।
  • কার্শিয়াঙে মহিলা ভোটারের সংখ্যা চার হাজার বেশি। সেখানে ৮৭ হাজার পুরুষ এবং ৯২ হাজার মহিলা ভোট দিয়েছেন। ভোটের হার ৮৩.১৪ শতাংশ।
  • দার্জিলিঙে মহিলা ভোটারের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে হাজারখানেক বেশি। সেখানে ৮৪ হাজার পুরুষ এবং ৮৬ হাজার মহিলা ভোট দিয়েছেন। ভোটের হার ৮২.২৭ শতাংশ।
  • মালকেন্দ্রে মহিলাদের চেয়ে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৪০০ বেশি। সেখানে ১ লক্ষ ১১ হাজার ৭৮১ জন পুরুষ, ১ লক্ষ ১১ হাজার ৮৩৯ জন মহিলা ভোট দিয়েছেন। ভোটের হার ৯৪.১৭ শতাংশ।
  • ঝাড়গ্রামে পুরুষের চেয়ে মহিলা ভোটারের সংখ্যা দু’হাজার বেশি। সেখানে ১.০৮ লক্ষ পুরুষ এবং ১.০৯ লক্ষ মহিলা ভোট দিয়েছেন। ভোটের হার ৯২.৬৩ শতাংশ।

মহিলাদের এই বাড়তি হার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি বড় বার্তা। এখন আর কেবল পুরুষদের পছন্দ-অপছন্দের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন জেতা সম্ভব নয়। বরং ‘মহিলা ভোটব্যাঙ্ক’ যে কোনও দলের ভাগ্য নির্ধারণে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতি উপহার দেবে বলে আশা করা যায়।

গণতন্ত্রের ভিত্তি আরও মজবুত

প্রথম দফার এই চিত্রটি কেবল একটি নির্বাচনের (Election Commission India) খবর নয়, এটি বাংলার সমাজব্যবস্থার এক ইতিবাচক পরিবর্তনের দলিল। যখন মায়েরা, বোনেরা এবং গৃহবধূরা নিজের অধিকার প্রয়োগে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হন, তখন সেই দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তি আরও মজবুত হয়। আগামী দফার নির্বাচনগুলোতেও (Bengal Assembly Election 2026) এই নারীশক্তির জয়যাত্রা বজায় থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা বিশেষজ্ঞ মহলের। 

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share